
এফএনএস : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্র ছাড়া শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে- কেন্দ্রীয় সরকারকে নীতি প্রণয়ন, তদারকি ও বাজেট প্রণয়নে সম্পৃক্ত রাখার। অপরদিকে সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার। কিন্তু এজন্য গণতন্ত্রের স্থায়ী ধারার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জনপ্রতিনিধিরা যে জনগণের সেবক- এই ধারণার বাস্তব রূপায়ন হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বুধবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক স্থানীয় সরকার সম্মেলন-২০১৩-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন। 'মিউনিসিপ্যাল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ' এবং বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম যৌথভাবে দু'দিনের এই সম্মেলনের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, এলজিআরডি ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, এলজিআরডি সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডবি¬উ মজেনা, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত এজভেন্ট অলি¬ং, ভারতের অল ইন্ডিয়া ইনিশিয়েটিভ অব লোকাল সেল্ফ গভর্নমেন্টের প্রেসিডেন্ট ড. জতিন ভি মোদি, ইউনিয়ন পরিষদ ফোরামের সভাপতি মাহবুবুর রহমান টুলু ও মিউনিসিপ্যাল এসোসিয়েশনের মহাসচিব শামীম আল রাজিব বক্তৃতা করেন। এতে সভাপতিত্ব করেন মিউনিসিপ্যাল এসোসিয়েশনের সভাপতি এডভোকেট আজমত উল¬াহ খান। শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর অধিকাংশ সময় সামরিক শাসন এবং সামরিক একনায়কতন্ত্র বা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ শাসন করায় স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি।
'জনগণকে যেন রাজধানী বা বিভাগীয় শহরগুলোতে যেতে না হয়, সে লক্ষে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন-শৃংখলা ও অবকাঠামো স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে চায়' উলে¬খ করে তিনি বলেন, 'আমরা আমাদের সকল কর্মকাণ্ড স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে চাই।' প্রধানমন্ত্রী জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে তাঁর সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, বিগত চার বছরে জাতীয় সংসদের ১৫টি আসনের উপ-নির্বাচনসহ ৫ হাজার ৫৫১টি নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ উঠেনি। 'বর্তমান সরকার জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী এবং এর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে চায়' উলে¬খ করে তিনি বলেন, জনগণের রায় যা'হোক না কেন, তাঁর দল তা মেনে নেবে। শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর বর্তমান মেয়াদে ৫ হাজার ৫৫১টি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ফলে গ্রামীণ জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে এক নিরব বিপ¬ব হয়েছে। এতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে এই ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে উন্নত সেবা দিতে সরকারের কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করায় পল¬ীর জনগণের ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী উলে¬খ করে তিনি বলেন, উন্নত, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারীরা এখনও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অবহেলিত। নারীর পুরো সামর্থ কাজে না লাগানোর ফলে বিশ্বে উৎপাদশীলতা কমেছে, প্রত্যাশিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়নি এবং সামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ জন্য তাঁর সরকার আইন সংশোধন করে বাংলাদেশের সকল স্থানীয় সরকার সংস্থায় নারীর জন্য আসন সংরক্ষণ করেছে। এছাড়া পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথেও নারীরা সরাসরি নির্বাচন করতে পারে বলে তিনি উলে¬খ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা সংশি¬ষ্ট এলাকার মানুষের আপদে-বিপদে, সুখে-দুঃখে ও দুর্যোগে তাদের পাশে থাকেন। এ জন্য বর্তমান সরকার স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী এবং এর দক্ষতা বৃদ্ধি ও আর্থিক ক্ষমতায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের সামর্থ বেড়েছে। তিনি বলেন, সরকারি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো অংশগ্রহণমূলক নীতি অনুসরণ করায় জনগণ কার্যকর সেবা লাভ করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে সরকার ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল¬া, রংপুর এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠন করেছে।
তিনি বলেন, 'আমরা ১৭টি নতুন পৌরসভা গঠন করেছি এবং ৫৬টি পৌরসভাকে সি-ক্যাটাগরি থেকে বি ক্যাটাগরিতে ও ৩০টি পৌরসভাকে বি-ক্যাটাগরি থেকে এ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা হয়েছে।' শেখ হাসিনা বলেন, সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত এবং স্থানীয় সরকারে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তিনি বলেন, তাঁর সরকার উপজেলা ও জেলা পরিষদ এবং সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি জনকল্যাণমূলক, দক্ষ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সার্বিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে তিনি আরও কয়েকটি সরকারি পদক্ষেপের কথাও উলে¬খ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, ২০ লাখ নতুন গ্রামীণ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান, কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, অনলাইন জন্ম নিবন্ধন চালু এবং জনপ্রতিনিধিদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও তাদের সম্মানিভাতা বৃদ্ধি।
সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে এই সম্মেলন নাগরিক সেবার যথাযথ ও কার্যকর উপায় উদ্ভাবন ও দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ত্বরান্বিত ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হবে। শেখ হাসিনা বলেন, এই সম্মেলন দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হবে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারিদ্র্য দূরীকরণে বাংলাদেশ 'স্টার পারফর্মার' হিসেবে বিবেচিত হবে। পরে প্রধানমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। দু'দিনব্যাপী এ সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের উলে¬খযোগ্য সংখ্যক জনপ্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন।